হিন্দুধর্মে দাহ কার্য: শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ও আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি

হিন্দুধর্মে দাহ কার্য: শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি

ভূমিকা: হিন্দুধর্মে মৃত্যুর পর মৃতদেহ দাহ করার প্রথা হাজার বছর ধরে চলে আসছে। অনেকেই প্রশ্ন করেনকেন দাহ করা হয়? কবর নয় কেন? এর উত্তর শুধু সামাজিক নয়, বরং গভীর দার্শনিক শাস্ত্রীয় ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই ব্লগে আমরা দেখব কেন হিন্দুরা দেহ দাহ করে এবং কোন কোন শাস্ত্রে এর ব্যাখ্যা রয়েছে।

. পঞ্চভূতে বিলয়: শরীর প্রকৃতির কাছে ফেরত যায়

হিন্দু দর্শনে বিশ্বাস করা হয়, মানুষের দেহ গঠিত হয়েছে পঞ্চভূতমাটি (পৃথিবী), জল, অগ্নি, বায়ু আকাশ থেকে। মৃত্যুর পর দেহ আবার এই উপাদানগুলিতেই মিশে যায়।

ক্ষিতি জল পাৱক গগন সমীর।

পঞ্চ রচিত অতি অধম শরীর

অর্থ: এই শরীরটি মাটি, জল, আগুন, আকাশ বায়ু দিয়ে গঠিতমৃত্যুর পরে তা প্রকৃতির মধ্যেই ফিরে যায়। সুতরাং, দাহ করার মাধ্যমে এই চক্র পূর্ণ হয়দেহ প্রকৃতিতে ফিরে যায়।

. অগ্নি: শুদ্ধিকরণ আত্মার বাহক

অগ্নিকে হিন্দুধর্মে দেবতাদের বাহক এবং পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। শবদাহের সময় বিশ্বাস করা হয়, অগ্নির মাধ্যমে আত্মা শুদ্ধ হয়ে যাত্রা করে পরলোকে।

ঋগ্বেদ ১০.১৪.১২:
"
अग्ने नय सुपथा राये अस्मान्।"

বাংলা উচ্চারণ:
অগ্নে নয় সুপথা রায়ে অসমান্।

অর্থ: হে অগ্নি, আমাদের উত্তম পথে নিয়ে চলো (অর্থাৎ আত্মাকে সৎগতি দাও)

. আত্মা অমর, দেহ নশ্বর

ভগবদগীতায় বলা হয়েছে, আত্মা কখনো মরে না। দেহ নশ্বর হলেও আত্মা চিরন্তন। তাই দেহ দাহ করে আত্মার মুক্তি প্রার্থনা করা হয়।


নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাৱকঃ। গীতা .২৩

অর্থ: এই আত্মাকে অস্ত্র ছিন্ন করতে পারে না, আগুন দাহ করতে পারে না। থেকেই বোঝা যায়, দাহ কেবল দেহেরআত্মার নয়।

. মনুসংহিতা গার্গ্য সংহিতায় নির্দেশ

শাস্ত্র মতে, মৃত্যু পরবর্তী ক্রিয়াকর্মে শবদাহ একটি বিধি হিসেবে বলা হয়েছে।
শরীরং দেহমুৎসৃজ্য অগ্নৌ কৃত্বা যথাবিধি। মনুসংহিতা .৫৯

অর্থ: মৃত্যুর পরে শরীরকে যথাবিধি অগ্নিতে দান করা উচিত।

গার্গ্য সংহিতা অনুসারে:

দেহ দাহ না করলে আত্মা দেহ-মোহে আবদ্ধ থাকে।

. মোহ কাটানো আত্মিক উপলব্ধি

দাহ কার্য আত্মীয়দের মনে জাগায় জীবন-অনিত্যতার উপলব্ধি। দেহের মোহ কাটিয়ে জীবনের মূল উদ্দেশ্যআত্মার মুক্তি ঈশ্বরলাভএর দিকে দৃষ্টি ফেরায়।

উপসংহার: হিন্দুধর্মে দাহ কার্য শুধুই একটি সামাজিক রীতি নয়, বরং এটি এক মহৎ আত্মিক এবং শাস্ত্রীয় আচার। এটি জীবনের চক্রের একটি পরিণতি এবং আত্মার চিরন্তন যাত্রার শুরু।

 


শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট